দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
দক্ষিণের খবর ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
হাতের মেহেদির রং তখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। নতুন সংসার, অনার্সে ভর্তি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্নে বিভোর ছিলেন আইভী আক্তার। বিয়ের পর মাত্র ১১ মাসের ব্যবধানে সেই স্বপ্নের সংসারেই নেমে এলো নির্মম পরিণতি। বাড়িতে একা থাকার সুযোগে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আইভীকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝে থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। স্বজনদের দাবি, হত্যার পর আইভীর ব্যবহৃত আইফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।ঘটনার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে স্বজনদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনি পুরো পরিবারে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক।গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের সাবেক কালিকাপুর গ্রামের একটি বাড়িতে ঘটে এ ঘটনা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় আইভীর চাচা কালাম শরীফ নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন। চাচি ছায়া বেগম ছিলেন মাদারীপুর শহরে। ওই সময় বাড়িতে একাই ছিলেন আইভী।নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে কালাম শরীফ ঘরের মেঝেতে আইভীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
আইভীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
আইভী ওই গ্রামের আসলাম শরীফের মেয়ে। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ছোটবেলা থেকেই চাচা কালাম শরীফের বাড়িতে বড় হন তিনি। স্বজন ও স্থানীয়দের কাছে শান্ত, ভদ্র ও মিশুক স্বভাবের মেয়ে হিসেবেই পরিচিত ছিলেন আইভী।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের পালং থানার বেনতপুর মুন্সীকান্দি এলাকার মৃত দলিলউদ্দিন সরদারের ছেলে কাতারপ্রবাসী ফেরদৌস সরদারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি দুই পরিবারকে জানানো হলে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়।বিয়ের এগারো মাস পার হয়েছে। বিয়ের পর নতুন সংসার নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন আইভী। এর পাশাপাশি এইচ এস সি পাস করে অনার্সে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর।কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
ঘটনার পর আইভীর বাবা আসলাম শরীফ বাদী হয়ে ১১ সেপ্টেম্বর মাদারীপুর সদর থানায় মামলা করেন। তবে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আইভীর স্বজনরা। তাঁদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের এতদিন পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাঁরা উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আইভীর ভাই আসিফ বলেন, “পুলিশ কেন আসামি ধরতে পারতেছে না, আমরা বুঝতে পারতেছি না। পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত আমার বোনের হত্যাকারীকে ধরে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করুক।”
আইভীর বাবা আসলাম শরীফ বলেন, “আমার মেয়েকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আমার মেয়েকে যারা হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। মামলা হওয়ার পরও কেন আসামিরা ধরা পড়ছে না, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
মেয়েকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন আইভীর মা আকলিমা বেগম। মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এখনো যারা তোরে মেরেছে, পুলিশ তাদের ধরতে পারেনি। আমরা তাদের বিচার করতে পারতেছি না। আল্লাহ তাদের বিচার করবে। তোরে যারা কষ্ট দিয়ে মারছে, তাদের শাস্তি হলে তুই কবরে বইসাও একটু শান্তি পাতি মা। আমরাও একটু শান্তি পেতাম। পুলিশের কাছে দাবি, তাড়াতাড়ি তাদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।”
স্বজনদের দাবি, আইভীকে হত্যার পর তাঁর আইফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ কারণে তাঁদের সন্দেহ, চুরির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নিহত আইভীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চুরির উদ্দেশ্যে, নাকি অন্য কোনো কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্তের পাশাপাশি অভিযান চলছে।”
আইভীর চাচা কালাম শরীফ বলেন, “নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরে ঘরের মেঝেতে আইভীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। তখন আমি চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে ডাকি এবং পুলিশকে খবর দিই। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হোক।”
চাচি ছায়া বেগম বলেন, “আইভী খুবই শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল। বাড়ির ভেতর এভাবে তার মরদেহ পড়ে থাকার ঘটনা আমাদের পুরো পরিবারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আইভীর যখন ১০ দিন বয়স তখন আমরা আইভীকে লালন পালন করে বড় করেছি। লেখাপড়া বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছি। ওর বাবা গরিব,তাই আইভীর সকল দায়িত্ব আমরা নিয়েছি লেদা কাল থেকেই। ও আমার মেয়ে না ও আমার মা। ওরা আমার মায়ের হত্যার বিচার চাই। এমনকি আমরা হত্যার প্রকৃত কারণ জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা দরকার।”
আইভীর মৃত্যুতে পরিবারটির পাশাপাশি এলাকায়ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাড়ির ভেতরে একা থাকা অবস্থায় একজন তরুণীর এভাবে হত্যার ঘটনা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।এত নিরাপত্তার ভিতরও কিভাবে কাজটি হলো আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে জানাই সত্যটি উদঘাটন করুক।
স্বজন ও এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নতুন সংসারের স্বপ্ন, পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই এখন অতীত। আইভীর পরিবারের কাছে পড়ে আছে শুধু তাঁর স্মৃতি আর একটি প্রশ্ন—কেন এমন নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হলো তাঁদের প্রিয় মেয়েটিকে?
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team